আদিল সরকার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: ‘মুখে মারিস না, গায়ে মার যেন কাউকে দেখাতে না পারে’ এই এক বাক্যেই যেন নির্যাতনের ভয়াল চিত্র ভেসে উঠে। শুধু নির্যাতনই শেষ নয়, বিবস্ত্র করে নেয়া হয়েছে একাধিক ভিডিও। সেই সাথে মারধরের কথা বাহিরে প্রকাশ করলে সেই ভিডিও নেট দুনিয়ায় ছেড়ে জীবন শেষ করে দেয়ার হুমকিও দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেত্রী।
আরও পড়ুন: রেল খাতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ
পায়ে ধরে মাপ চাইলেও ছাড় দেয়া হয়নি তাকে। অবশেষে রাতভর নির্যাতনের স্বীকার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে হয়েছে ওই ছাত্রীকে।
গত রবিবার রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ হাসিনা হলে এই ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত সানজিদা চৌধুরী অন্তরা পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। এর আগেও তার বিরুদ্ধে হলে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
নির্যাতনের ঘটনায় কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগী ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী ফুলপরি খাতুন। লিখিতপত্রে নিজের জীবন বাচাতে আকুতি জানিয়েছেন সে।
আরও পড়ুন: আরও ১৫ জনের করোনা শনাক্ত
অভিযোগপত্রে ওই ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ডিপার্টমেন্টের ২০২০-২১ এর তাবাসসুম নামের এক সিনিয়র আপু রুমে দেখা করতে বলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে রুমে না যাওয়ায় তিনি আমার উপর চড়াও হন।
পরে তাদের রুমে গেলে আমার সাথে খারাপ আচরণ করে ভয়ভীতি দেখাতে থাকেন। সেই সাথে হল থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন। এসময় তারা বলেন, তুই আমাদের না বলে হলে উঠেছিস তার মানে অবৈধভাবে হলে উঠেছিস। তখন আমি তাদেরকে এলাকার বড় আপুর কাছে গেস্ট হিসেবে সাময়িক সময়ের জন্য আছি বলে জানাই।
এসব নিয়ে তাদের সাথে বনিবনা না হওয়ায় প্রথম দফায় শনিবার রাতে আমাকে ডেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালায় তারা। একইসাথে হল থেকে বের করে দিতে চান। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানালে পরদিন রবিবার বিকেলে হল প্রভোষ্ট এবং সহকারী প্রক্টোরের হস্তক্ষেপে বিষয়টি মীমাংসিত হয়।
কিন্তু ওইদিন আবারো রাত ১১টায় ছাত্রলীগ নেত্রী অন্তরাসহ ৭-৮ জন আমাকে একটি গণরুমে নিয়ে যান। এসময় তারা আমাকে এলোপাতাড়িভাবে চড় থাপ্পড় মারতে থাকেন। আমাকে কেন মারছেন বলতে গেলে উনারা আমার মুখ চেপে ধরেন এবং তারা বলতে থাকেন, ‘চিনিস আমাদের তুই আমরা কত খারাপ? আমরা তোর কি করতে পারি কোন আইডিয়া আছে আমাদের সম্পর্কে?’
আরও পড়ুন: নারীদের নামে করা যাবে ধর্ষণের মামলা
এসময় আমি কান্না করে ওনাদের পা ধরে মাফ চাইতে গেলে তারা পা দিয়ে লাথি মারেন। সাথে অকথ্য ভাষা গালিগালাজ করতে থাকেন। পরে আমার বুকের উপর হাত দিয়ে জোর করে থাবা মারেন এবং গামছা দিয়ে আমার গলায় ফাঁস দিয়ে বারবার টান দিতে থাকেন৷ এসময় তারা বলেন ‘যা বলবো একটা কথাও যেন বাইরে না যায়। একপর্যায়ে তারা একটা ময়লা গ্লাস আমাকে মুখ দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নেন এবং সেটার ভিডিও করেন।
তারপর তারা আমাকে জামা খুলতে বলেন। আমি খুলতে না চাইলে তারা আমাকে আবারো মারতে শুরু করেন। পরে জোর করে আমার জামা খুলে হাসাহাসি করতে থাকেন। সেই সাথে আমার বিবস্ত্রের ভিডিও ধারণ করেন তারা। যদি বাইরের কাউকে একথা বলি তাহলে আমার এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দেয়ার হুমকি দেন এবং বলেন তখন কিন্তু কাউকে মুখ দেখাতে পারবি না।
এছাড়া অন্তরা বলেন, ‘তুই যদি প্রশাসনের কাছে কোন অভিযোগ দিস, তাহলে তোকে মেরে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবো, যা বলেছি তা মনে থাকে যেনো।’ একইসাথে তারা প্রভোস্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয় লিখে দিয়ে বলেন, হাসবি আর এগুলা বলবি। পরে এগুলোও তারা ভিডিও করে রাখেন। মারধরের সময় তারা বলেন, ‘মুখে মারিস না, গায়ে মার যেন কাউকে দেখাতে না পারে।'
রাতভর টর্চার শেষে রাত প্রায় চারটার দিকে ওই ছাত্রীকে একটি গণরুমে পাঠিয়ে দেয় ছাত্রলীগকর্মীরা। পরেরদিন সকালে জীবন বাঁচাতে হল থেকে পালিয়ে গ্রামের বাড়ি পাবনাতে চলে যান বলে লিখিততে জানান ভুক্তভোগী ।
তবে অভিযোগের বিষয়ে অস্বীকার করে ছাত্রলীগ নেত্রী সানজিদা চৌধুরী অন্তরা সাংবাদিকদের বলেন, সে এক সিনিয়রের সঙ্গে বেয়াদবি করেছিল। তবে পরবর্তীতে প্রক্টর ও প্রভোস্ট স্যাররা বিষয়টা মীমাংসা করেন। রাতের মধ্যে আর কোনো কিছুই হয়নি। এ ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
তবে র্যাগিংয়ের বিষয়ে ওয়াকিবহাল আছেন বলে জানিয়েছেন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাত। তিনি বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে ছাত্রলীগ নেত্রীর এই বিভৎস নির্যাতনের বিষয়টি জানাজানি হলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কেউ কেউ লিখেছেন, এসব ঘটনার সমাধান অভিযোগ পত্রেই শেষ হয়ে যাবে। এগুলো পুরানো ইতিহাস। প্রসাশন তাদের কখনোই বিচার করবেন না, নয়তো করতে পারবেন না। দিনশেষ তাদের মিলিয়ে দিবেন কথা-বার্তা বলে। নবীন শিক্ষার্থীদের র্যগিংয়ের ঘটনায় কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
তবে র্যাগিংয়ের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শেলীনা নাসরিন বলেন, র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে আমরা বরাবরই জিরো টলারেন্স। বিষয়টির সত্যতা যাচাই করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঘটনায় হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, প্রথম বর্ষের এক মেয়ে কিছু সিনিয়রদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে বলে অভিযোগ করেছিলো কয়েকজন ছাত্রী। পরে আমি ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা মিলে বিষয়টি মিটমাট করে দেই। কিন্তু পরে তার সাথে যা হয়েছে তা জানিনা। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহাদৎ হোসেন আজাদ বলেন, অভিযোগপত্র পেয়েছি। উভয় পক্ষের কথা শুনে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চার সদস্যদের একটি কমিটি করেছেন বলে জানা গেছে।
সান নিউজ/এনকে