নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরিশাল: বরিশাল নৌ-বন্দরে ভেড়া পারাবত-১১ লঞ্চের কেবিন থেকে উদ্ধার জান্নাতুল ফেরদৌস লাবনীর ঘাতক তারই দ্বিতীয় স্বামী মনিরুজ্জামান চৌধুরী। ঢাকা থেকে ওই লঞ্চে বরিশালে যাওয়ার পথে ঝগড়ার জেরে মনির তার তৃতীয় স্ত্রী লাবনীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
গ্রেপ্তারকৃত মনিরের স্বীকারোক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে এ তথ্য জানালেও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, নানা আলামত ও ঘাতক মনিরের নানা মিথ্যাচারে ধারণা করা হচ্ছে, এটি ঠাণ্ডা মাথায় পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
লাবনী হত্যার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই মনিরকে গ্রেপ্তারের পর আরও বলেছে, তিনি লঞ্চের কেবিন ভাড়া নেওয়ার সময় নিজেকে ‘কামরুল’ নামে পরিচয় দিয়েছে। নিজের মোবাইল নম্বরও ভুল দিয়েছেন। সে কারণে ধারণা করা হচ্ছে, মনিরুজ্জামান পূর্বপরিকল্পিতভাবেই লঞ্চের কেবিনে হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণ করে লাবনীকে নিয়ে লঞ্চে ওঠেন।
গ্রেপ্তারকৃত মনির ওরফে কামরুল গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এলাকার আব্দুস শহীদের ছেলে। তিনি ঢাকার মিরপুর-১ এর দারুস সালাম প্রিন্সিপাল আবুল কালাম রোডের সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। তিনি ঢাকায় রাইড শেয়ার করতেন। অন্যদিকে নিহত জান্নাতুল ফেরদৌস লাবনী ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আদমপুর গ্রামের বাবা আব্দুল লতিফ মিয়ার মেয়ে। বাবার সঙ্গে তিনি মিরপুরের পল্লবীতে বসবাস করতেন। তার প্রথম স্বামী ওলিয়র রহমানের বাড়িও ভাঙ্গা উপজেলায়। প্রথম স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর ঢাকায় গিয়ে মনিরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হয় তার।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে পিবিআই বরিশাল জেলা কার্যালয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) হুমায়ুন কবির জানান, নিহত জান্নাতুল ফেরদৌস লাবনী মনিরুজ্জামানের তৃতীয় স্ত্রী। বিপরীতে লাবনীর দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন মনিরুজ্জামান। ঘটনার দিন গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে দুজনে বরিশালে আসার উদ্দেশ্যে লঞ্চের কেবিনে ওঠেন। মনিরের দাবি, কেবিনে বসে দুজনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হলে উত্তেজিত হয়ে তিনি ওড়না গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে স্ত্রীকে হত্যা করে। হত্যার পর কৌশলে খুব ভোরে লঞ্চ থেকে নেমে তিনি বাসযোগে ঢাকায় নিজ বাসায় ফিরে যান।
পিবিআইয়ের এসপি জানান, সিসিটিভির ফুটেজ ও মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে লাবনীর ঘাতক তার স্বামী মনিরকে শনাক্ত করে পিবিআই। যদিও কেবিনে কামরুল নাম ব্যবহার করাকে যথেষ্ট রহস্যজনক এবং হত্যার পূর্বপরিকল্পনা বলে মনে করছে পুলিশের এই সংস্থাটি। অভিযানে মনিরুজ্জামানের কাছ থেকে নিহত লাবনীর ব্যবহৃত ওড়না, মোবাইলসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি মনিরুজ্জামানকে লঞ্চে যে শার্টটি পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে, সেটিও জব্দ করা হয়।
পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতের সকল বক্তব্যই আমরা বিশ্বাস করছি না। তবে সব কিছু খতিয়ে দেখছি। মনির কেন লঞ্চে কামরুল নামে কেবিন ভাড়া নিয়েছিলেন, তা ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। আমরা কোনো কিছুকেই সন্দেহের বাইরে রাখছি না। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘাতককে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পিবিআই। তেমনি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের মূল কারণও উদঘাটন করা হবে।
বরিশাল সদর নৌ-থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, নৌ-পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলাটি করেছে। গ্রেপ্তারকৃত মনিরুজ্জামান চৌধুরীকে তাদের হেফাজতে নেওয়া হচ্ছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তের স্বার্থে রিমান্ডের আবেদনও জানানো হতে পারে।
ঢাকা থেকে বরিশাল নদীবন্দরে আসা পারাবত-১১ লঞ্চের ৩৯১ নম্বর সিঙ্গেল কেবিন থেকে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে অজ্ঞাত হিসেবে লাবনীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। লঞ্চের কেবিনবয় পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ওই কেবিনে গিয়ে দরজা খোলা অবস্থায় তার মরদেহ খাটের ওপর পরে থাকতে দেখতে পান। খবর পেয়ে নৌ-পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়না তদন্তের জন্য শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। সুরতহাল ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে বিষয়টি হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরে তদন্তে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। তদন্তের প্রথমভাগেই ওই নারীর নাম লাবনী ও তার বিস্তারিত পরিচয় জানতে পারে পিবিআই।
সান নিউজ/ এআর