ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম : কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) চিফ ফিন্যান্স অফিসার (সিএফও) হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর নেশা নারী আর টাকা। এই দুই কারণে ব্যক্তি জীবনে তিনি খুইয়েছেন একাধিক চাকরিও। তারপরও ছুটে চলেছেন এই নেশার পিছনে।
বর্তমানে তার বিরুদ্ধে উঠেছে পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ। নানা জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্যতম লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটির লাভের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে তার পকেটে। শুধু তাই নয়, হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর বিরুদ্ধে উঠেছে অধীনস্থ অফিসের নারী কর্মীদের যৌন হয়রানির নানা অভিযোগ।
সূত্র মতে, বাংলাদেশ সরকার, জাপান, নেদারল্যান্ড এবং ডেনমার্কের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির আন্তর্জাতিক সকল বীমা পদাধিকারবলে মোকাবিলা করেন হাবিব উল্লাহ মঞ্জু। সে সুবাদে এখান থেকে তিনি হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ।
কোম্পানির তরল কস্টিক সোডা জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্যাদি সংগ্রহের দায়িত্বে আছেন তিনি। মিশর, ওমান এবং সৌদি আরব থেকে ইউএফ-৮৫ রাসায়নিক ক্রয়ের ক্ষেত্রেও এই কর্মকর্তা বড় অংকের কমিশন নিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তরল এমোনিয়া বিদেশে রপ্তানি এবং জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইউরিয়া সার পাঠানোর জন্য কাফকো কোম্পানির রয়েছে নিজস্ব জেটি। জাহাজের ধাক্কায় জেটির একটি স্তম্ভ নষ্ট হলে কোনো রকম টেন্ডার ছাড়াই নিয়ম বহির্ভূতভাবে সেই জেটি মেরামতের জন্য সিঙ্গাপুরের একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি।
তাতেও রয়েছে বিস্ময়ের ব্যাপার। একটি মাত্র স্তম্ভ মেরামতের জন্য সংস্থাটির সাথে প্রায় ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি করেছেন হাবিব উল্লাহ। টেন্ডার ছাড়া এই জেটি মেরামতে অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় প্রকারান্তরে হাবিবুল্লাহ মঞ্জুর পকেট ভারি করাই একটি কূটকৌশল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানের অর্থসাশ্রয় বা লাভ-ক্ষতির চেয়ে অস্বাভাবিক অর্থ রোজগারই হাবিব উল্লাহর ধ্যানজ্ঞান। তার লক্ষ্য-কেবল টাকা আর টাকা। যেভাবেই হোক, যে পন্থায় হোক-কাড়ি কাড়ি টাকা কামানো তার অসম, অদ্ভুত এক খায়েস!
সূত্র মতে, হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর আছে প্রবল সিঙ্গাপুরপ্রীতি। আর এর যথার্থতা পাওয়া যায় সিঙ্গাপুরের সংস্থাকে অবৈধভাবে বিনা টেন্ডারে জেটি মেরামতের কাজ পাইয়ে দেয়া, সিঙ্গাপুরে ব্যাংক একাউন্টের পাশাপাশি প্রতিবছর স্ব-পরিবারে সিঙ্গাপুরে বিলাসবহুল ভ্রমণে। আর কাফকোতে যোগদানের পর থেকে বিদেশ ভ্রমণ তার নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে।
শুধু কি টাকা উপার্জনের নেশা? হাবিব উল্লাহ মঞ্জুর বিরুদ্ধে আছে যৌন হয়রানি ও নানা স্ক্যান্ডাল। অভিযোগ, কর্মস্থলে অধীনস্থ নারীকর্মীদের যৌন হয়রানি করেন শুধু নয়, ইনিয়ে-বিনিয়ে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব, নানা কৌশলে তাদের বাগে আনার চেষ্টা করেন তিনি। প্রস্তাবে সম্মত না হলে তাদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দুর্নীতির পাশাপাশি নারী কর্মীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগে এর আগে তিনি সোনারগাঁও হোটেল, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি খুঁইয়েছেন। অথচ কাফকোতে চাকরি পেতে তিনি পূর্বের কর্মস্থলে চাকরি হারানো এবং সেসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তাদের নাম গোপন করেছিলেন।
এছাড়া কাফকো থেকে বাড়তি বেতন সুবিধা পেতে ডিবিএলে যা পেতেন তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেতন দেখিয়েছেন মঞ্জু। শুধু তাই নয়, ৩ বছরের চুক্তিতে নিয়োগ পেলেও বাংলাদেশি বোর্ডের কয়েকজন সদস্যকে মোটা অংকের অর্থ এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক সুবিধা দিয়ে ৩ বছর পার হওয়ার পরও অদ্যবধি বহাল তবিয়তেই আছেন হাবিব উল্লাহ মঞ্জু।
তথ্য মতে, কাফকোতে যোগদানের পর অর্থনৈতিকভাবে বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেন তিনি। এখানে যোগদানের পর থেকে তার সম্পত্তি কেনার প্রবণতা বেড়ে যায়। দেশে বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্টের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরেও রয়েছে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। অভিযোগ আছে সেই ব্যাংক একাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করছেন এই কর্মকর্তা।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটাই সত্য নয় বলে দাবি করেছেন কাফকোর সিএফও হাবিব উল্লাহ মঞ্জু। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে কেউ হয়তো আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। নারী কর্মীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ ভিত্তিহীন। কোনো নারীকে আমি হেনস্তা করেছি কেউ বলতে পারবে না।
তবে সিঙ্গাপুরে ব্যাংক একাউন্ট থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এতে তো সমস্যার কিছু দেখছি না। আর পরিবার নিয়ে প্রতিবছরই ঘুরতে যাই আমি। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে অনৈতিক প্রস্তাব দেন তিনি।
তিনি বলেন, জেটির ইন্স্যুরেন্স থাকায় এর ক্ষতির সম্পূর্ণ টাকা আমরা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে ফেরত পাবো, যা প্রক্রিয়াধীন। এই মুহূর্তে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হলে আমাদের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। কারণ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তখন নানা অজুহাত দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে চাইবে না।
এছাড়া প্রতিবেদনটি প্রকাশ হলে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। আমার সম্পর্কে মানুষের একটি খারাপ ভাবমূর্তি তৈরি হবে। সেটা আমার জন্য ক্ষতিকর হবে।
সান নিউজ/কেটি