নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঘোষণা এবং তার নির্দেশনায় বাংলার মুক্তিকামী জনতা পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আর মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে ভারতীয় বাহিনী। এ দুই শক্তির সম্মিলিত আক্রমণে পিছু হটতে শুরু করেছে পাকিস্তানি সেনারা। মুক্ত হচ্ছে বাংলার একের পর এক জনপদ।
একাত্তরের ১১ ডিসেম্বর মুক্ত করা হয় যশোর এলাকা। যশোরের মুক্ত এলাকায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বৈঠক করে দীপ্তকন্ঠে কয়েকটি সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।
তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো: ১. বাংলাদেশ সরকার ওয়ার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। এ ট্রাইব্যুনাল নরহত্যা, লুণ্ঠন, গৃহদাহ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে যুদ্ধবন্দিদের বিচার করবে। ২. ২৫ মার্চের আগে যারা যে জমি-দোকানের মালিক ছিলেন তাদের সব ফিরিয়ে দেয়া হবে। ৩. সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে। ৪. জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপি, নেজামী ইসলামী নিষিদ্ধ করা হবে।
এমন পরিস্থিতিতে একাত্তরের ১১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাব দেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর ড. এম এ মালেক। সাংবাদিক ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী গভর্নরের পক্ষে ৫টি শর্তে আত্মসমর্পণের কথা জানিয়েছেন।
এগুলো হল: ১. পাকিস্তানি বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। ২. বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তারা কোনও লিখিত চুক্তি করবে না। ৩. পশ্চিম পাকিস্তানের এক লাখ নাগরিককে ফেরত যেতে দিতে হবে। ৪. পাকিস্তানি সৈন্যদেরও পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে দিতে হবে। ৫. সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়া হবে।
কিন্তু ইয়াহিয়া খান এ প্রস্তাব নাকচ করেন। বরং তিনি পাকিস্তানকে যুদ্ধে সহায়তা দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান। যদিও প্রেসিডেন্ট নিক্সন এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকেন। যুক্তরাষ্ট্র শুধু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নেয়ার জোর দাবি জানায়। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এদিন জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব মেনে নেয়া ভারত-পাকিস্তান উভয়ের জন্যই অত্যাবশ্যক।
এদিন লে. জেনারেল নিয়াজী ঢাকা বিমানবন্দর পরিদর্শন করতে এসে দম্ভভরে বলেন, কোনও ক্রমেই শত্রুকে কাছে ঘেঁষতে দেয়া চলবে না। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের ঐতিহ্যকে আরও উজ্জ্বল করবে। পরে বিমানবন্দরে তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে সর্বশেষ যুদ্ধপরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করেন। যদিও রণাঙ্গনে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে পাকবাহিনী হটে যাচ্ছিল।
কোথাও তারা আত্মসমর্পণ করছিল, কোথাও পালিয়ে ঢাকার পথে রওনা হচ্ছিল। এই পালানোর পথে পাকবাহিনী বিভিন্ন গ্রামে গণহত্যা চালায়। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করতে করতে তারা পিছিয়ে যেতে থাকে। এদিন হিলি সীমান্তে মিত্রবাহিনী প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। সন্ধ্যায় সম্মিলিত বাহিনী বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের মধ্যবর্তী গোবিন্দগঞ্জে শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটির ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়।
সারা রাত যুদ্ধের পর ভোরের দিকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় হানাদার পাক বাহিনী। জামালপুর গ্যারিসন সম্মিলিত বাহিনীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে। হালুয়াঘাট এলাকায় প্রচণ্ড সংঘর্ষের পর পাকবাহিনীর আরও একটি ব্রিগেড প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে অস্ত্র, গোলাবারুদ ফেলে টাঙ্গাইলের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। এ সময় শত্রুবাহিনী রাস্তার বড় বড় সব সেতু ধ্বংস করে দিয়ে যায়।
অপরদিকে ময়মনসিংহে অবস্থানরত শত্রুবাহিনীর আর একটি ব্রিগেড শহর ত্যাগ করে টাঙ্গাইলে তাদের ঘাঁটিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সম্মিলিত বাহিনী রাতে বিনা প্রতিরোধে জামালপুর দখল করে নেয়।জাতিসংঘের অনুরোধে এদিন সকালে মিত্রবাহিনীর বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।
উদ্দেশ্য, বিদেশি নাগরিকদের ঢাকা ত্যাগের ব্যবস্থা করার জন্য বিমানবন্দর মেরামতের সুযোগ করে দেয়া। সন্ধ্যায় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী যুদ্ধবিরতি ও পাকিস্তানিদের ঢাকা থেকে অপসারণের ব্যবস্থা করার জরুরি আবেদন জানান। এদিন ঢাকায় বিকাল ৩টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করা হয়।
সান নিউজ/এসএ